উজানের ঢলে তলিয়ে যাচ্ছে ধানক্ষেত, সুনামগঞ্জে কৃষকের হাহাকার
সুনামগঞ্জের হাওরে অকাল বন্যার আঘাত, তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ বোরো ধানক্ষেত
লেখক: আজহারুল আলম সিপু

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বর্ষণের ফলে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে হঠাৎ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার ছোট-বড় প্রায় ১৪০টি হাওর এখন পানিতে প্লাবিত, আর এতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চলতি মৌসুমের বোরো ধান। সরকারি হিসেবে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেলেও স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি, যা লাখো কৃষকের জীবিকা নিয়ে তৈরি করেছে চরম অনিশ্চয়তা।
জেলা কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক ঢলে এরই মধ্যে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা এখন বুক সমান পানিতে নেমে আধা-পাকা ও পচা ধান কাটার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, শনিবার সকালে সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে পানি বিপৎসীমার ১.৪৭ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বৃষ্টির পরিমাণ। গত বছরের তুলনায় এ বছর সুরমা নদীর পানি অনেক বেশি উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, আজ শনিবার পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র আরও ভয়াবহ। স্থানীয়দের দাবি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২০ হাজার হেক্টর ছাড়িয়ে গেছে। মধ্যনগর উপজেলার দুটি হাওরে বাঁধ ভেঙে এরই মধ্যে কয়েকশ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক জানান, জেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৯ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। গত বছরের এই সময়ে যেখানে ৮৩ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছিল, সেখানে এ বছর বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধান কাটার গতি অত্যন্ত ধীর।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কৃষকরা কোমর সমান এমনকি বুক সমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন। পচা ধানের গন্ধে হাওরের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। কৃষকরা জানান, ফসল ডুবে যাওয়ায় তারা এখন দিশেহারা। গত ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণে কোনো প্রস্তুতির সুযোগই পাননি তারা।
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাওলাদার জানিয়েছেন, আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েক দিন এই অঞ্চলে আরও ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। ফলে নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এদিকে, ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে সুনামগঞ্জ জেলাকে ‘দুর্গত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করার জন্য সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছেন জেলার সাধারণ মানুষ ও কৃষক সংগঠনগুলো। কৃষকদের দাবি, সরকারি সহায়তা ছাড়া এই বিশাল ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।






