শ্রীমঙ্গলে প্রথমবারের মতো দেশোয়ালি সমাজের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত
ঐক্য শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশোয়ালি জনগোষ্ঠীর বৃহৎ সমাবেশ।
এম. মুসলিম চৌধুরী, মৌলভীবাজার

চলো এক হই, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে লালন করি, উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলি এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশোয়ালি সমাজ মিলনমেলা ও আলোচনা সভা ২০২৬। গত (২৯ মে) শ্রীমঙ্গল জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে এ অনুষ্ঠানটি উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়।
অনুষ্ঠানে মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, রাজনগর, বড়লেখা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত দেশোয়ালি জনগোষ্ঠীর শত শত নারী পুরুষ শিক্ষার্থী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেন। প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই মিলনমেলা পারস্পরিক পরিচিতি ও ভ্রাতৃত্ববোধে এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি করে।
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক ও দেশোয়ালি সমাজের প্রবীণ অভিভাবক কৃষ্ণলাল কালোয়ারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট প্রসূতি ও গাইনি বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা সুধাকর কৈরী।
স্বাগত বক্তব্যে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাজেন কৈরী বলেন দেশোয়ালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক ঐক্য আরও সুদৃঢ় করাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। তিনি নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত ও আদর্শবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা সুধাকর কৈরী বলেন এই সমাজের সকলকে সর্বাবস্থায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। শিক্ষা অধিকার ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন যেকোনো প্রয়োজনে সমাজের মানুষ সরাসরি তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন এবং তিনি সাধ্যমতো পাশে থাকার চেষ্টা করবেন।
অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন প্রকাশ ভর সজল কৈরী এবং বিজয় নুনিয়া। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রাজনগর সরকারি কলেজের প্রভাষক সঞ্জিত যাদব, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রামভজন কৈরী, মাধবপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান পুষ্প কুমার কানু, বাংলাদেশ চা শ্রমিক কমিউনিটির প্রথম নারী গ্র্যাজুয়েট সারদা গোয়ালা, বাংলাদেশ দেশোয়ালি সমাজ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল প্রসাদ কানু এবং সহ সাধারণ সম্পাদক সংযুক্তা দুবে।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পরাগ বারই, মিলন শীল, ইউপি চেয়ারম্যান প্রাণেশ গোয়ালা, ব্যবসায়ী জয়প্রকাশ কৈরীসহ সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
আলোচনা সভায় বক্তারা সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তারা অসহায় পরিবারকে সহযোগিতা শিক্ষা সহায়তা এবং নতুন প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে দেশোয়ালি জনগোষ্ঠীকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করা, পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করা, দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় সহায়তা করা, অসহায় পরিবারের কন্যাদের বিয়েতে সহযোগিতা করা, নতুন প্রজন্মকে দক্ষ ও যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা এবং দেশোয়ালি সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করা।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কানু সমাজের সাধারণ সম্পাদক নির্মল কানু, জেনারেল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বত্বাধিকারী অশোক পাশী, সাবেক স্বাস্থ্য পরিদর্শক দিলীপ কুমার কৈরী, ছাত্র প্রতিনিধি শুভ কৈরী, হৃত্তিক রাম যাদবসহ লোহার, তেলী, পাশী, যাদব, ছত্রী ও বারই জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।
মিলনমেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। লক্ষ্মীনারায়ণ পাশী ও তার দলের পরিবেশনায় এবং সারদা গোয়ালার অংশগ্রহণে ভোজপুরী ভাষার গান, লোকসংগীত ও ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশিত হয়। পুরো অডিটোরিয়ামজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
ঐতিহ্য সংস্কৃতি শিক্ষা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যয় নিয়ে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়। অংশগ্রহণকারীরা প্রতিবছর এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার দাবি জানান।






